ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাম্প্রদায়িক কারণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি: আবদুল গাফফার চৌধুরী

আবদুল গাফফার চৌধুরী
আবদুল গাফফার চৌধুরী

বঙ্গভঙ্গের কারণে মুসলামনদের সান্ত্বনা দেয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে- এমন ধারণাকে ভুল বলে মন্তব্য করেছেন ভাষাসৈনিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো- এই প্রবাদ আমি বিশ্বাস করি না।

বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুল মতিন ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য আবদুল গাফফার চৌধুরী।

ভাষাসৈনিক, কলামিস্ট ও বুদ্ধিজীবী আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, শতবছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রতিবছর এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন মেধা, নতুন নতুন প্রতিভা যুক্ত হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার লাভের সূচনায় এশিয়ার মধ্যে আধুনিক ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রবর্তনে এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি অগ্রদূত বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে একটি প্রবাদ প্রচলিত। এটি হলো- বঙ্গভঙ্গের পরে আবার বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের খুশি করার জন্যে এই বিশ্ববিদ্যালয় আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে আমার ধারণা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপমহাদেশের প্রথম অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী বিশ্ববিদ্যালয়। সমসাময়িককালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রদায়িকতা ছিলো। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলো না। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, যদিও পূর্ববঙ্গের মুসলমান শিক্ষার্থীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলো কিন্তু তাদের অধিকাংশ শিক্ষক ছিলেন অন্য সম্প্রদায়ের। রমেশ চন্দ্র মজুমদার দীর্ঘকাল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। সুতরাং এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো- এই প্রবাদ আমি বিশ্বাস করি না।

‘ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অসীম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অথবা আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় যে কাজটি করতে পারেনি, সেই কাজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করে দেখিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র গঠন করেছে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বেগমান করেছে, বাংলা ভাষাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় উন্নীত করেছে। আজ বাংলা একাডেমিতে বাংলা ভাষা নিয়ে যত গবেষণা হয়, তার অধিকাংশই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা করে থাকেন।’

তিনি বলেন, গত শতকের পঞ্চাশের দশক ছিলো বাংলাদেশের বাঙালির রেনেসার কাল। এটি ছিলো শিল্প-সাহিত্য, বিজ্ঞান চর্চায় পূর্ব বাংলার বাঙালির নব উন্মেষের কাল। এতে নেতৃত্ব দিয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই দশকেই এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ত্রিশের দশকে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন শুরু হয়। এতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছিলো। এসময় তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়া বিখ্যাত ব্যক্তিদের অবদানের কথা উল্লেখ করেন।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে গুলিবর্ষণের পরেই শহীদ রফিকের লাশ দেখে আমি আমার গানটি লিখি। এটি এখন ভাষা আন্দোলনের গান- ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি?’।

সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড.মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আবদুল গাফফার চৌধুরীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পেয়ে আমরা তার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

আজকে আমরা যারা দায়িত্বে নিয়োজিত আছি তাদের মূল কাজ হলো ঢাবির সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে অভিনন্দন জানানো ও আবদুল গাফফার চৌধুরী যে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন তার বিষয়টিকে উপলব্ধি করা। তিনি তার বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পটভূমি থেকে শুরু করে আজ অবধি এটার অর্জন, কার্যক্রম এবং মোটা দাগে যে ঘটনাগুলো হয়েছে তা উল্লেখ করেছেন। ত্রিশের দশকে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা গঠনে ভূমিকা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে ধারণা ছিল যে বঙ্গভঙ্গ রদের কারণে সাম্প্রদায়িক কারণে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটাকে তিনি খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে এটা প্রতিষ্ঠার পেছনে কোনো সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। মূলত এই তিনটি বিষয় তিনি তার বক্তব্যে আমাদেরকে স্মরণ করে দিয়েছেন।

উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্বের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস গণহত্যার স্বীকার হয়নি আমার জানা মতে। কিন্তু, ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও এদেশের দোসররা সার্চলাইট নামে যে অপারেশন চালায় তার মূল লক্ষবিন্দু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বিশেষত, জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি স্থাপনাই আক্রমণের স্বীকার হয়েছে। এছাড়াও পতাকা উত্তোলন করে একটি জাতি রাষ্ট্রের উত্থান এটিও বিশ্বের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এই দুটি মানদণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে বলে মন্তব্য করেন উপাচার্য।

এসময় বিশ্বিবদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগের চেয়ারম্যান, ইনস্টিটিউটের পরিচালক,কোষাধ্যক্ষ ও বিভিন্ন সমিতির সদস্যরা ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন। #

  • ঢাকাটাইমস