কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছে ঝিকরগাছার মেঘনা

এম আলমগীর, ঝিকরগাছা ::  যুব ও যুব নারীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সমাজসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নারী উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন মেঘনা খাতুন। তিনি নারী উদ্যোক্তা ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পেন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। স্বামীর সহযোগিতা নিয়ে সংসার সামলিয়ে যে সমাজসেবায় কাজ করে অবদান রাখা যায় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মেঘনা খাতুন।
মেঘনা খাতুন ১৯৮৭ সালে ঝিকরগাছার মাটশিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা লুৎফর আলী মোল্যা ও মাতা জোহরা বেগম। ২০০৪ সালে বামনআলী গ্রামের মৃত বাবর আলীর ছেলে ইমদাদুল হক ইমদাদের সাথে তার বিয়ে হয়। তিনি বিএসসি (অনার্স), এমএসসি (ভূগোল ও পরিবেশ) ডিগ্রী অর্জন করে সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ২০০৫ সাল হতে তিনি কম্পিউটার ও যুব উন্নয়ন এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সহ বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে যুব ও যুব নারী উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন।

অত্র অঞ্চলের বেকার, অদক্ষ যুব ও যুব মহিলাদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে বিশেষত্ব বেকার, অসহায়, অদক্ষ ও স্বামী পরিত্যাক্তা মহিলাদের এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমানের লক্ষে যশোরের ঝিকরগাছায় পেন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মেঘনা খাতুন স্বামী ইমদাদুল হক ইমদাদের সার্বিক সহয়োগিতায় ঝিকরগাছায় রূপান্তর কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার নামে একটি আধুনিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কে›ন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে এবং এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি ও বিপুল পরিমাণ ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকতর আধুনিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে কপোতাক্ষ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কে›ন্দ্র নামে আরও একটি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অনুমোদনক্রমে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠান থেকে ০৬ মাস মেয়াদী অফিস এ্যাপ্লিকেশন, ডাটাবেস প্রোগ্রামিং, গ্রাফিক্স ডিজাউন, ডিজিটাল ভূমি জরিপ, ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কোর্সে মোট ২ হাজার ৩ শত ৯৩জনসহ সর্বমোট ৩ হাজার ৮শত ৫০ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে যশোর তথা ঝিকরগাছা ও পাশ্ববর্তী এলাকার অসংখ্য যুবক-যুব মহিলা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ স্বাবলম্বী হয়েছে। অনেকে চাকুরিতে প্রবেশ করেছে। আবার কেউ কেউ ফ্রি-ল্যান্সিং প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার সাথে জীবন-যাপন করছে।
২০০৫ সাল তিনি থেকে অনগ্রসর, অবহেলিত, বেকার মহিলাদের আত্ম-কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে দর্জ্জিবিজ্ঞান, এমব্রয়ডারী, ব্লক-বাটিক ও হস্তশিল্প বিষয়ক দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং প্রশিক্ষিত মহিলাদের তৈরী হস্তশিল্প পণ্য বিক্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেই লক্ষ্যে ঝিকরগাছায় প্রতিষ্ঠা করেন রূপান্তর হস্তশিল্প এন্ড ফ্যাশন পার্ক শো-রুম। এখনও পর্যন্ত এ কার্যক্রমে মোট ১ হাজার ৫শত ৭০জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে এবং পেন ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রদানকৃত হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রায় ৮৫০ জন মহিলাকর্মী নিজেরাই হাতের কাজের থ্রি-পিচ, নকশীকাঁথা, শাড়ী, বেডশীট, পাঞ্জাবীসহ নানান রকম হস্তশিল্প পণ্য তৈরী করছে এবং এসকল পণ্য পেন ফাউন্ডেশন দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিদেশে বিক্রয়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

ঝিকরগাছাঞ্চলের সমাজে পিছিয়ে পড়া, সুবিধাবঞ্চিত, হতদরিদ্র, অসহায় শিশু যাদের অনেকেরই মা-বাবা ফেলে রেখে অন্যত্র চলে গেছে, কারোর মা-বাবা নেই, সে সকল শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো পৌছে দিতে ২০১৭ সাল থেকে মেঘনা খাতুন নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বপ্নলোকের পাঠশালা। ঝিকরগাছায় অবস্থিত সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বপ্নলোকের পাঠশালা’র ০২টি ক্যাম্পাসে চলতি ২০২১ সালে ১৭০জন শিক্ষার্থী সম্পূন্নভাবে ফ্রি-তে লেখাপড়া করছে এবং ২০১৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত মোট ৪৮০জন শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা শেষ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করছে। মেঘনা খাতুন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লেখাপড়ার খরচ মেটানোর জন্য ঝিকরগাছায় বেকার, অসহায় ও অদক্ষ মহিলা এবং স্বপ্নলোকের পাঠশালার হতদরিদ্র অভিভাবকদের হস্তশিল্প প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং তাদের তৈরী হস্তশিল্পপণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থের লভ্যাংশ দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষায় ব্যয় করে থাকেন।
কোভিড-১৯ মহামারি প্রতিরোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ও আহবানে অদম্য মানসিকতা নিয়ে “পেন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মেঘনা খাতুন যশোরের মার্চ, ২০২০ হতে অধ্যবধি করোনা ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলা এবং এর বিস্তার রোধে বিভিন্ন কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পেন ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত স্বপ্নলোকের পাঠশালা’র শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষদের মাঝে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান, হ্যান্ডস্যানিটাইজার, পোস্টার এবং লিফলেট বিতরণ, শিক্ষার্থীদের মাঝে শিশু খাদ্য হিসেবে সুজি, গুড়া দুধ, চিনি, বিস্কুট এবং অভিভাবকদের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ, মানবিক সহায়তায়- চাল, ডাল, তেল, আলু, চিনি, পেঁয়াজ, সবজি, লবণ বিতরণ, ঈদ উপলক্ষে স্বপ্নলোকের পাঠশালা’র শিক্ষার্থীদের ঈদ পোশাক এবং অভিভাবকদের মাঝে ঈদ সামগ্রী- সেমাই, চিনি, চাল, ডাল, তেল ও দুধ বিতরণ, উপজেলার ইউনিয়নসমূহে ওয়ার্ড ভিত্তিক মোট ১০৮টি স্বেচ্ছাসেবক কমিটি গঠন, বিদেশ থেকে আগতদের ১৪দিন পর্যন্ত নিজ বাড়িতে অবস্থান নিশ্চিত করানো বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবক দল স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও প্রশাসনকে সহযোগিতা প্রদান, করোনার স্বাস্থ্য বিধি মানার জন্য মাইকিং, করোনা ভাইরাসে পজিটিভ ব্যক্তিদের ওষুধ, ফলমূল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ, উপজেলার বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বাজারে নিয়মিতভাবে বিলিসিং পাউডার মিশ্রিত পানি ছিটানো, নারী ও শিশুদের পাচার প্রতিরোধ প্রোগ্রাম, মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা (স্যানিটেশন) নিশ্চিতকরণ, প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন প্রোগ্রাম, দল গঠন ও সঞ্চয় মনোভাব সৃষ্টি প্রোগ্রাম, এইডস প্রতিরোধ প্রকল্প, বন্যার্তদের সাহায্য প্রদান, মৎস্যচাষ ও হাঁস মুরগী পালন প্রকল্প, বনায়ন ও নার্সারী কর্মসূচী, ধুমপান ও মাদক বিরোধী কার্যক্রম, বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য স্বেচ্ছাসেবক টীম গঠন সহ বিভিন্ন স্বেচ্চাসেবী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

মেঘনা খাতুন সামাজিক কর্মকান্ডে অবদানের জন্য উপজেলা পর্যায়ে সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান ক্যাটাগরীতে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে উপজেলা পর্যায়ে “শ্রেষ্ঠ জয়িতা ২০১৭” নির্বাচিত হন এবং সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) এর তরুণদের সংগঠন ইয়াং বাংলা কর্তৃক “জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড-২০২০” এ টপ ৫০ নির্বাচিত হয়েছেন।
মেঘনা খাতুন আমৃত্যু সমাজসেবা এবং মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। তিনি একাজে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। #